July 10, 2026, 11:10 pm

সরকার নির্ধারিত দামের ধারেকাছেও নেই আলু পেঁয়াজ ডিম

সরকার নির্ধারিত দামের ধারেকাছেও নেই আলু পেঁয়াজ ডিম

মাত্র ১০ টাকা কমাতে আলু বিক্রেতা মুজিবুর রহমানের হাত ধরলেন ক্রেতা আবদুল লতিফ। পাইকারি দরে তিনি পাঁচ কেজি আলু কিনতে চান, যার দাম ২২০ টাকা অর্থাৎ ৪৪ টাকা কেজি। লতিফ সর্বোচ্চ ২১০ টাকা দাম দিতে চাইছেন; কিন্তু মুজিব ২২০ টাকার কমে বিক্রি করতে রাজি নন। ক্রেতা তার হাত ধরে আকুতি জানালেও তিনি অপারগ।

এ দৃশ্য রাজধানীর কারওয়ান বাজারের। ক্রেতার অনুরোধ রাখতে না পারার কারণ জানতে চাইলে মুজিবুর রহমান প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরা আড়ত থেকেই ৪২ টাকা কেজিতে আলু কিনেছি। ক্রেতার কথা রাখতে গেলে তো এক টাকাও লাভ থাকে না। এমনিতেই ৬০ কেজির এক বস্তা আলুতে প্রায় দুই কেজি নষ্ট থাকে। বস্তাপ্রতি শ্রমিককে দিতে হয় ২০ টাকা। ভিটের ভাড়া হিসেবে প্রতি বস্তায় ৭০ টাকা। নিজেরও খরচ আছে। সব যোগ করার পর এক কেজি আলু অন্তত ৪৮-৫০ টাকায় বিক্রি করতে হয়। পাঁচ কেজি হলে ৪৪ টাকা পর্যন্ত রাখা যায়।’

অন্যদিকে পাঁচ কেজিতে ১০ টাকা কমাতে না পেরে আলু না কিনেই মলিন মুখে ফিরে যাচ্ছিলেন আবদুল লতিফ। এ সময় প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, পশ্চিম রাজাবাজারে তার পরিবারসহ বসবাস। ১০ টাকা বাঁচাতে পারলে সংসারের কিছুটা উপকার হবে ভেবে সে চেষ্টাই করছেন তিনি।

শফিকুল ইসলাম নামের আরেক ক্রেতাও পাঁচ কেজি আলুর দাম ২২০ টাকা শুনে চলে যান। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে আসেন। বীজ ব্যবসায়ী শফিকুল বলেন, ৩-৪টা দোকান ঘুরে দেখলাম। কোথাও ২২০ টাকার কমে পাঁচ কেজি আলু পাওয়া যাচ্ছে না।

বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার গত বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো আলু, পেঁয়াজ ও ডিম এ তিন পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে আলুর দাম প্রতি কেজি ৩৫-৩৬ টাকা, ডিম ৪৮ টাকা হালি এবং পেঁয়াজ ৬৪-৬৫ টাকা কেজি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু গতকাল কোথাও সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে এ তিনটি পণ্য বিক্রি হতে দেখা যায়নি।

সরেজমিনে রাজধানীর কারওয়ান বাজার, তেজগাঁওয়ের কলমিলতা কাঁচাবাজার, মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজার ও জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের কৃষকের বাজারে গিয়ে সরকার নির্ধারিত দামের ধারেকাছেও এসব পণ্য বিক্রি হতে দেখা যায়নি।

বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এভাবে দাম বেঁধে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব না। এটা করতে হলে ব্যবসায়ীদের কিছু সময় দিতে হবে। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে সবার আগে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। কারওয়ান বাজারের মুদি দোকানি জয়নাল আবেদিন বলেন, সরকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে না বসে একটা দাম ধরে দিয়েছে। এ দাম তো বাজারে চলবে না। তাদের উচিত আগে বড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসা। তা না করে সরকার যদি আগে শুধু দাম ধরে দেয় সেটি বাস্তবায়ন হবে না। কেননা আমরা তো বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পণ্য কিনি। আমি ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে ব্যবসা করছি। সব সময় দেখে আসছি, যত জরিমানা সব খুচরা বিক্রেতাদের ওপর। বড় ব্যবসায়ীদের কাছে সরকার যায় না।

তিনি আরও বলেন, কয়েক দিন আগে দেখলাম সিন্ডিকেটের ব্যাপারে বাণিজ্যমন্ত্রীকে ধরার কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু কোনো ফল তো বাজারে দেখছি না। আমরা খুচরা ব্যবসায়ীরা জরিমানা গুনছি। অথচ এখন দোকান চালাতে দম বেরিয়ে যায়। মানুষের হাতে টাকা নেই। কোনোমতে জীবন ধারণ করছে। দর বেঁধে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হলে বড় ব্যবসায়ীদের আগে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তা না হলে কোনো কাজ হবে না।

রাজধানীর কলমিলতা কাঁচাবাজারে দেখা যায়, ফার্মের প্রতি হালি ডিম বিক্রি ৫৫ টাকায়, আলু প্রতি কেজি ৫০ টাকা ও পেঁয়াজ ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কারওয়ান বাজারে খুচরা পর্যায়ে লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ৫০-৫৫ টাকা হালি। সাদা ডিম ৪৪ টাকা ও হাঁসের ডিম ৮০-৯০ টাকায়। ডিম বিক্রেতা সাঈদুর রহমান বলেন, তিনি ১১৩০ টাকা দরে ১০০ ডিম কিনেছেন। সে হিসাবে প্রতি ডিমে খরচ পড়েছে ১১ টাকা ৩০ পয়সা। এর সঙ্গে অন্যান্য ব্যয় মিলে প্রতিটি ডিমে ১২ টাকার মতো খরচ হয়।

মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে ঘুরে দেখা যায়, আলু ৫০ টাকা, ডিম ৫৫ টাকা ও পেঁয়াজ ৮৫-৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে আলু, পেঁয়াজ ও ডিমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এবং স্যালাইনের মূল্য স্থিতিশীল ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর গতকাল সারা দেশের বিভিন্ন বাজারে অভিযান চালিয়েছে। তার মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে তিনটি টিম অভিযান চালায়। রাজধানীর মিরপুর শাহ আলী মার্কেট ও মিরপুর-১ নম্বর, কারওয়ান বাজার, শান্তিনগর বাজার ও মালিবাগ কাঁচাবাজার এবং যাত্রাবাড়ী ও কুতুবখালী বাজার এলাকায় অভিযান চালানো হয়।

কারওয়ান বাজারে অভিযান চালান ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রোজিনা সুলতানা ও আসিফ আল আজাদ। অভিযান চালাতে গিয়ে তারা দেখেন সেখানে পুনোনো দামেই ডিম, আলু, পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। ভোক্তা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রশ্নের জবাবে এই বাজারের ব্যবসায়ীরা বলেন, নতুন দরের পণ্য না আসা পর্যন্ত আগের দামেই বিক্রি করতে হবে। এ সময় কয়েক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করতে চাইলে তারা বলেন, আপনারা আমাদের এই দামে পেঁয়াজ দেন আমরা বিক্রি করব।

অভিযানের বিষয়ে রোজিনা সুলতানা বলেন, কারওয়ান বাজারে শুধু আড়তে ডিম বিক্রি হচ্ছে ১১ টাকা ৪০ পয়সা। পেঁয়াজ ও আলু আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, নতুন পণ্য হাতে না পাওয়া পর্যন্ত দাম কমবে না।

দেখা গেছে, কারওয়ান বাজারে ভালোমানের এক কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৮২ টাকায়। ভারতের আমদানি করা পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

পেঁয়াজ, আলু ও ডিম বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি হচ্ছে কি না তা শক্তভাবে মনিটর করা হচ্ছে জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ভোক্তা অধিকারের জনবল সংকট রয়েছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী যার সুবিধা নিচ্ছেন। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সব সময় ব্যবসায়ীদের যে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তা কিন্তু নয়। এরপরেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা শক্ত অবস্থানে রয়েছি।

এদিকে গতকাল বাজারে পেঁয়াজ, আলু ও ডিম সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি হতে দেখা যায়নি কেন জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ.এইচ.এম সফিকুজ্জামান গতকাল বলেন, ব্যবসায়ীদের কিছুটা সময় দিতে হবে। আশা করি ধীরে ধীরে বাজারে পণ্যগুলো নির্ধারিত দামে বিক্রি হবে। বাজারব্যবস্থা ঠিক হয়ে আসবে। তিনি জানান, আলুর মজুদ দেখতে তিনি আজ মুন্সীগঞ্জ যাবেন। সেখানে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে জেলার হিমাগার মালিক সমিতির সদস্যসহ আলুর পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে সার্বিক বিষয়ে অবগত হবেন।

এদিকে ভোক্তা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ ও প্রচার) আতিয়া সুলতানা জানান, পেঁয়াজ, আলু, ডিমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এবং স্যালাইনের মূল্য স্থিতিশীল ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গতকাল ৪১টি টিম দেশের ৩৯ জেলার ৫৩টি বাজারে অভিযান পরিচালনা করেছে। অভিযানে ৯০টি প্রতিষ্ঠানকে সর্বমোট ২ লাখ ৩৭ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, শুক্রবার বাজারে গিয়ে আমি সরকার নির্ধারিত দামে ডিম, পেঁয়াজ ও আলু বিক্রি হতে দেখিনি। শুধু দাম নির্ধারণ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। আর বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে অল্প কয়েকজন দিয়ে বাজার মনিটরিংও সম্ভব নয়। ভারতে প্রতিটি ডিমের দাম ৬ টাকা হলে আমাদের দেশে ১২ টাকায় বিক্রি হবে কেন? আর ডিমের সাড়ে ১০ টাকা যে উৎপাদন খরচ দেখানো হয়েছে তাও ঠিক নয়। এটি আরও কম হবে। কেননা দেশে ভুট্টার আবাদ বাড়ছে, চালের কুঁড়া (চাল ছেঁটে ফেলার পর বাড়তি অংশ) পরিমাণ বাড়ছেÑ অতএব মুরগির খাদ্যের দামও কমবে।

তিন পণ্যে সরকারের এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার জানতে চাইলে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে তিনটি কাজ করতে হবে। এক. সরকারের মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং বাড়িয়ে যারা বেশি দামে বিক্রি করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। দুই. দাম না কমলে আমদানির পথ খুলে দিতে হবে। তিন. বিশেষভাবে ডিমের ক্ষেত্রে প্রকৃত উৎপাদন খরচ কত তা বের করা দরকার। এজন্য হ্যাচারি আইন করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com